আসুন গাড়ি চালনা শিখি(Let's Learn How to Drive) - পর্ব-৩

 পর্ব-৩

গত পর্বে আমরা গাড়ির ইঞ্জিন চালু করা (starting engine), গাড়িকে আগে বাড়ানো (moving off), গাড়িকে থামানো(pull over) এবং ইঞ্জিন বন্ধ করা(stopping engine) ইত্যাদি শিখেছি।

আশা করছি, আপনারা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে চর্চা করেছেন। এখন নিশ্চয়ই গাড়ির গতি বাড়ানোর জন্য মনটা ছটফট করছে। ইনশাআল্লাহ, এই পর্বে আমরা তা-ই করবো। প্রথমে গতি বাড়ানো শিখবো, তারপর গতি কমানো শিখবো।

মূল কাজে যাওয়ার পূর্বে গিয়ারের গতিসীমা জেনে রাখা প্রয়োজন। নিচে একটা আনুমানিক ছক দেয়া হলো। গাড়ি ভেদে তথ্যগুলো অবশ্যই হেরফের হবে। তবে আপাতত কাজ চালানোর জন্য এগুলোকেই আদর্শ মনে করুন।

ফার্স্ট গিয়ার – ০ মাইল থেকে ৭/৮ মাইল

সেকেন্ড গিয়ার – ১০ মাইল(বা তার কাছাকাছি) থেকে ২০ মাইল(বা তার কাছাকাছি)

থার্ড গিয়ার – ২০ মাইল(বা তার কাছাকাছি) থেকে ৩০ মাইল(বা তার কাছাকাছি)

ফোরথ গিয়ার – ৩০ মাইল(বা তার কাছাকাছি) থেকে ৪০ মাইল(বা তার কাছাকাছি)

ফিফথ গিয়ার – ৪০ মাইল(বা তার কাছাকাছি) থেকে ৫০ মাইল(বা তার কাছাকাছি)

গাড়ির গতি বাড়ানো

এখন পর্যন্ত আমরা ক্লাচ, গিয়ার আর ব্রেইকের ব্যবহার দেখেছি। এবার আমাদের প্রয়োজন পড়বে এক্সিলারেটরের। বলাবাহুল্য, ক্লাচ, গিয়ার এবং এক্সিলারেটর এর সম্মিলিত ব্যবহার আমরা শিখবো।

পূর্ব প্রস্তুতি সেরে নিন। আগের পর্বে বর্ণনা করা আছে।

মনে রাখবেন, আমরা সমতল ভূমিতে চালাচ্ছি।

১. ইঞ্জিন চালু করুন।

২. ক্লাচ একদম নিচ পর্যন্ত চেপে ধরুন।

৩. নিউট্রাল থেকে ফার্স্ট গিয়ারে নিন। ক্লাচ চেপে রাখুন।

৪. পার্কিং ব্রেইক অফ করুন।

৫. ক্লাচ আস্তে আস্তে ছেড়ে বাইটিং পয়েন্টে এনে ২/৩ সেকেন্ড ধরে রাখুন। গাড়ি সামনে বাড়তে শুরু করবে। ক্লাস ধীরে ধীরে ছেড়ে দিন। এভাবে গাড়ি চলতে থাকলে মোটামুটি ৭/৮মাইল/ঘন্টা পর্যন্ত গতিবেগ পাবে। ড্যাশবোর্ডের mph মিটারে(speedometre) দেখুন।

৬. এবার খুব হালকা করে এক্সিলারেটরকে সামান্য দাবান। এর ফলে গতিবেগ ১০ বা তার কাছাকাছি আসবে এবং গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ পাল্টে যাবে। গাড়ি কেমন কেমন জানি করছে, ঝাঁকি দিচ্ছে ইত্যাদি। তার মানে হচ্ছে, গাড়ির ইঞ্জিনের ঘূর্ণনের সাথে চাকা (তথা যান্ত্রিক অংশ) খাপ খাওয়াতে পারছে না।

উর্ধ্ব গিয়ার-এ পরিবর্তন

গাড়ির গতি এখন ১০ এর উপরে। তারমানে ফার্স্ট গিয়ার থেকে সেকেন্ড গিয়ারে যাওয়ার এখনই সময়। পরবর্তী ৭ ও ৮ নং ধাপ হচ্ছে গিয়ার পরিবর্তন এর ধাপ।

৭. এ অবস্থায় এক্সিলারেটর পুরো ছেড়ে দিয়ে ক্লাচ চেপে ধরুন আর ফার্স্ট গিয়ার থেকে সেকেন্ড গিয়ারে নিয়ে যান। পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করুন – প্রথমে এক্সিলারেটর ছাড়তে হবে, তারপর ক্লাচ চেপে ধরতে হবে, তারপর গিয়ার পরিবর্তন করতে হবে।

৮. গিয়ার পরিবর্তন করার পর ক্লাচ ধীরে ধীরে বাইটিং পয়েন্টে এনে ২/৩ সেকেন্ড ধরে রাখতে হবে। তারপর (ধীরে ধীরে) পুরো ছেড়ে দিতে হবে।

৯. ক্লাচ ছেড়ে দিয়েই এক্সিলারেটর হালকা চেপে ধরতে হবে। কিছুক্ষণ আগে ঠিক যে পর্যায় পর্যন্ত এক্সিলেটরকে দাবিয়েছিলেন ঠিক সে পর্যন্ত এক্সিলেটর দাবাতে হবে। ফলে আমরা চলতি গতিতে চলতে থাকবো।

১০. এক্সিলারেটর আরো একটু চেপে ধরলে গতি আরো বাড়বে। যত বেশি চেপে ধরা হবে গতি তত বাড়বে। এক্সিলারেটর চেপে গাড়ির গতি আস্তে আস্তে বাড়াতে বাড়াতে ১০ থেকে ২০ বা তার কাছাকাছি নিয়ে আসুন। এবারও একই ঘটনা ঘটবে। ইঞ্জিনের শব্দ আগের মত পাল্টে যাবে, একটু যেন ঝাঁকি দিতে থাকবে। শব্দ শুনে আপনাকে বুঝে নিতে হবে গাড়ি কী চায়। গাড়ি চায় ইঞ্জিনের গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেন গিয়ার পাল্টানো হয়।

আমাদের গতি ২০ বা তার কাছাকাছি।

১১. সুতরাং এক্সিলারেটর পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে ক্লাচ চেপে ধরুন। ক্লাচ চেপেই গিয়ার থারড গিয়ারে নিন। ক্লাচ বাইটিং পয়েন্টে ধীরে ধীরে আনুন। ২/৩ সেকেন্ড বাইটিং পয়েন্টে ধরে রাখুন।তারপর ছেড়ে দিন।

১২. তারপর এক্সিলারেটর চেপে ধরুন যাতে চলমান গতি বজায় থাকে। আগে যতটুকু দাবিয়েছিলেন ততটুকু দাবান। এবার যদি গতি আরো বাড়াতে চান তবে এক্সিলারেটর আরেকটু হালকা নিচের দিকে দাবান। গতি বাড়তে থাকবে।

এরপর গতিবেগ ৩০ বা তার কাছাকাছি এনে আগের প্রক্রিয়ায় গিয়ার পরিবর্তন করে ফোরথ এ আনুন।

এরপর ৪০ বা তার কাছাকাছি এনে একই নিয়মে ফিফথ গিয়ারে রাখুন।

এখন আবার উপরের ছকটি দেখুন। আর লেখাটি আবার পড়ুন। পুরো বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে:

১. প্রথমে কাংখিত গতি সীমায় আনতে হবে, তারপর গিয়ার পরিবর্তন করতে হবে। আগে গিয়ার পরিবর্তন করে তারপর গতি বাড়ানো যাবে না। আগে গতি তারপর গিয়ার পরিবর্তন।

২. এক্সিলারেটর দিয়ে গতিবেগ বাড়িয়ে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। তারপর ক্লাচ পুরো চেপে ধরে গিয়ার পরিবর্তন করতে হবে।গিয়ার পরিবর্তন করেই ক্লাচ ছেড়ে দিতে হবে। তারপর আবার এক্সিলারেটর চেপে ধরতে হবে। বুঝে বুঝে বার বার করে করে পুরো প্রক্রিয়াটি আত্মস্থ করতে হবে।

৩. ক্লাচ ছাড়ার সময় দুই ধাপে ছাড়তে হবে। একদম চাপানো অবস্থা থেকে বাইট পয়েন্ট পর্যন্ত, তারপর বাইট পয়েন্ট থেকে একদম ছেড়ে দেয়া পর্যন্ত।মাঝখানে বাইট পয়েন্টে ২/৩ সেকেন্ড ধরে রাখতে হবে।

৪. ক্লাচ মসৃণভাবে চাপতে এবং ছাড়তে হবে। তদরূপ এক্সিলারেটরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন চাপবেন মসৃণভাবে চাপবেন, যখন ছাড়বেন মসৃণভাবে ছাড়বেন।

৫. গতি ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। গতি বাড়ানোর সাথে সাথে গিয়ার ধারাবাহিকভাবে 1 থেকে 2, 2 থেকে 3, 3 থেকে 4, 4 থেকে 5 এভাবে পরিবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ 1, 2, 3, 4, 5 ক্রমানুসারে পরিবর্তন করতে হবে। ক্রম ভেংগেও করতে পারেন। অর্থাৎ 1, 3, 5 এভাবে বা ২ থেকে সরাসরি ৫ এভাবেও কেউ কেউ করেন। এটাকে বলে Block Gear Changing।তবে গতি বাড়ানোর সময় এটা না করাই উত্তম।

উল্লেখ্য, গতি বাড়ানোর যে পদ্ধতি উপরে বর্ণনা করা হলো তা একদম নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। নতুনদের কাছে যেন বিষয়টা জটিল না লাগে এবং সহজেই শিখে ফেলতে পারে সে উদ্দেশ্যে পদ্ধতিটি দেখানো হলো। পরবর্তীতে আরো উত্তম পন্থা দেখানো হবে, ইনশাআল্লাহ। তবে আপাতত নতুনরা অবশ্য অবশ্য পদ্ধতিটিকে বার বার চর্চা করে ভয় কমাবে এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করবে। তাহলেই পরবর্তীতে দেখানো পন্থাগুলো সহজ মনে হবে।

গতি তো বাড়ালেন। এবার কমাবেন কিভাবে? আলীবাবার মত সিসিম ফাঁক বলে তো ভেতরে ঢুকলেন। বেরুনোর মন্ত্র না জানলে বেরুবেন কিভাবে? তো, সেটাও শিখে নেয়া যাক।

গাড়ির গতি কমানো

ধরুন, এখন আমরা ফিফথ গিয়ারে ৫০ মাইল বেগে চলছি। আমরা ধীর ধীরে গাড়ির গতি কমাবো।

এই কাজটা আমরা দু’টি পন্থায় করতে পারি।

পন্থা-১

গতি কমানোর সাথে সাথে গিয়ার নামাতে থাকা

ব্রেইক আস্তে আস্তে চাপতে থাকুন। গতি যখন ৫০ থেকে ৪০ এ আসবে তখন ক্লাচ চেপে ফিফথ গিয়ার থেকে ফোরথ গিয়ারে আনুন। ক্লাচ আস্তে আস্তে ছেড়ে বাইটিং পয়েন্টে এনে ২/৩ সেকেন্ড ধরে রেখে পুরোপুরি ছেড়ে দিন। ব্রেইক কিন্তু ছাড়বেন না। বরঞ্চ আরো একটু দাবান। ফলে গতি আরো কমে আসবে। যখন ৩০ এ আসবে তখন ক্লাচ চেপে একই নিয়মে থার্ড গিয়ারে আনুন। এভাবে ২০ এ আসলে সেকেন্ড এ আনুন। মোদ্দা কথা হলো গতিসীমা অনুযায়ী গিয়ার পরিবর্তন করুন। ১০ বা ১০ এর কাছাকাছি গতি নিয়ে আসুন। ঠিক যেখানটায় থামাতে চাচ্ছেন তার আগে ঠিক দুই গাড়ি দূরত্বে থাকতেই ক্লাচ পুরোপুরি চাপুন, ফার্স্ট গিয়ারে আনুন এবং ব্রেইক আরো কষে ধরে গাড়ি থামান।

আবার চলতে চাইলে ব্রেইক ছেড়ে দিন।ক্লাচ ধীরে ধীরে বাইটিং পয়েন্টে আনুন। ২/৩ সেকেন্ড সেখানে ধরে রাখুন। তারপর পুরোপুরি ছেড়ে দিন। গাড়ি আবার চলতে শুরু করবে।

আর যদি চান গাড়ির ইঞ্জিনসহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে তবে গিয়ার নিউট্রলে নিয়ে আসুন। ক্লাচ ছেড়ে দিন। পার্কিং ব্রেইক অন করুন। পায়ের ব্রেইক ছেড়ে দিন। চাবি বাম দিকে(ঘড়ির কাটা বিপরীত দিকে) ঘুরিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ(অফ) করুন। তারপর আরো একটু মোচড় দিয়ে Locked করুন।

পন্থা-২

গতি কমানোর একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ার নামানো

ব্রেইক ধীরে ধীরে কষতে থাকুন। গতি আস্তে আস্তে ৫০, ৪০, ৩০, ২০, ১০ এভাবে কমে আসতে থাকবে। ঠিক যেখানটায় থামতে চাচ্ছেন তার আগে প্রায় দুই গাড়ির দূরত্বে পৌঁছে ক্লাচ পুরোপুরি চেপে ধরুন ও ব্রেইক আরো কষে গাড়িকে কাংখিত জায়গায় দাঁড় করান। ফার্স্ট গিয়ারে আনুন। অর্থাৎ ফিফথ থেকে সরাসরি ফার্স্ট গিয়ারে।

আবার চলতে চাইলে ব্রেইক ছেড়ে দিন। ক্লাচ ধীরে ধীরে বাইটিং পয়েন্টে আনুন। ২/৩ সেকেন্ড সেখানে ধরে রাখুন। তারপর পুরোপুরি ছেড়ে দিন। গাড়ি আবার চলতে শুরু করবে।

আর যদি চান গাড়ির ইঞ্জিনসহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে তবে গিয়ার নিউট্রলে নিয়ে আসুন। ক্লাচ ছেড়ে দিন। পার্কিং ব্রেইক অন করুন। পায়ের ব্রেইকও ছেড়ে দিন। চাবি বাম দিকে(ঘড়ির কাটা বিপরীত দিকে) ঘুরিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ(অফ) করুন। তারপর আরো একটু মোচড় দিয়ে Locked করুন।

এভাবে গিয়ার পরিবর্তন করাকে বলে Block Gear Changing। আমরা ধারাবাহিকভাবে (5, 4, 3, 2 এভাবে) গিয়ার পরিবর্তন না করে সরাসরি 5 থেকে 1 এর নিয়ে আসলাম। আপনি ইচ্ছে করলে 5 থেকে 3 বা 2 এও আসতে পারেন। একইভাবে 4 থেকে 2 বা 1 ।

এ পর্বে আমরা শিখলাম কিভাবে গাড়ির গতি বাড়াতে ও কমাতে হয়।

মনে রাখবেন

১. থেমে থাকা গাড়িকে চালিত করতে চাইলে ফার্স্ট গিয়ার থেকেই শুরু করতে হবে। অন্য কোনো গিয়ার থেকে শুরু করতে গেলে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে যাকে ইংরেজিতে বলে stalling।অবশ্য ঢালু রাস্তা দিয়ে নামার সময় সেকেন্ড গিয়ার থেকে শুরু করা যেতে পারে।

Comments