আসুন গাড়ি চালনা শিখি (Let's Learn How to Drive) - পর্ব-২

 পর্ব-২

10:31am 8July, 2022, Friday

------

গাড়ি চালানো শুরু করার জন্য মোটামুটি যতটুকু জানা প্রয়োজন ততটুকু আমরা গত পর্বে জেনেছি। এ পর্বে আমরা গাড়ি চালাবো, ইনশাআল্লাহ।

তবে গাড়ি চালানো শুরু করার পূর্বে সতর্কতামূলক কিছু প্রস্তুতি আমাদেরকে নিতেই হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার এবং আপনার গাড়ীর জীবন ড্রাইভিং এর চেয়ে মূল্যবান :P

পূর্ব প্রস্তুতি -১

একটি বড় সমতল মাঠে অনুশীলন করতে হবে। ব্যস্ত সড়ক, মহা সড়কে অনুশীলন করতে যাওয়া একদম ঠিক হবে না। সেতু, স্বপ্নসেতু এসবে তো প্রশ্নই আসে না। আর ঢালু জায়গায়ও পরিহার করতে হবে।

পূর্ব প্রস্তুতি -২

একা একা গাড়ি চালনা শিখতে যাবেন না। অবশ্য অবশ্য একজন দক্ষ চালক/প্রশিক্ষককে সাথে নিয়ে চর্চা করুন।

পূর্ব প্রস্তুতি -৩

প্রথমেই গাড়ির সাজ-সরঞ্জামকে চালকের (তথা আপনার) উপযোগী করে তুলতে হবে।

চালকের আসনে গিয়ে বসুন। আসনটিকে সামনে-পিছনে সরানো যায় এবং উঁচু-নিচু করা যায়। হেলান দেয়ার তাকিয়াটিকেও নড়ানো যায়। এগুলো করার জন্য আসনের মধ্যেই সুইচ রয়েছে। খুঁজে না পেলে চালক/প্রশিক্ষকের সাহায্য নিন। স্টিয়ারিংটিকেও উপর-নিচ করা যায়।

আমি আপনাকে কিছু হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে দিচ্ছি। সে অনুযায়ী আসন আর স্টিয়ারিং সেট করে নিন।

আসনের হেলান দেয়ার তাকিয়া বসার জায়গার(সিটের)সাথে ১০০-১১০ ডিগ্রি কোণে থাকবে।

আসনে বসে এক্সিলারেটর, ব্রেইক এবং ক্লাচ সহজে পা দিয়ে নাগাল পাওয়া এবং চেপে ধরা যায় কিনা দেখুন।

স্টিয়ারিংয়ের একদম উপরে দু’হাতের মুঠির গোড়া পাশাপাশি রেখে হাত সোজা করুন। স্টিয়ারিং থেকে আপনি ঠিক এতটুকু পরিমাণ দূরত্বে থাকবেন।

স্টিয়ারিংকে আমরা ঘড়ির মত কল্পনা করি। ঘড়ির ৩টা ও ৯টা-র কাঁটা যে জায়গায় থাকে ঠিক সে জায়গায় দু’হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরতে হবে। এটা সবচেয়ে ভালো পন্থা।

স্টিয়ারিং ধরার পর দু’হাতের বগল লাগানো থাকবে। কনুই শরীরের সাথে মোটামুটি ১০ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্বে থাকবে।

স্টিয়ারিং এমনভাবে থাকবে যেন আপনি এর উপরের অর্ধবৃত্তের ফাঁক দিয়ে ড্যাশবোর্ড ভালোভাবে দেখতে পাবেন। এবং সামনের দিকে তাকালে রাস্তা ভালোভাবে দেখতে পাবেন। স্টিয়ারিংয়ের জন্য যেন রাস্তা দেখতে অসুবিধা না হয়।

পেছনে দেখার আয়না (লুকিং গ্রাস) গুলিকে সেট করুন যেন ঠিকমত সব দেখতে পান।

এসব বিষয়ে ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও পাবেন। প্রয়োজনে সেগুলো দেখুন।

সিটবেল্ট লাগান।

পূর্ব প্রস্তুতি -৪

এ পর্যায়ে গাড়ি চলার জন্য প্রস্তুত আছে কিনা দেখুন।

হ্যান্ডব্রেইক লাগানো (অন) আছে কিনা দেখুন। লাগানো না থাকলে টেনে তুলে লাগান।

গিয়ার নিউট্রলে আছে কিনা পরীক্ষা করুন। নিউট্রলে না থাকলে নিউট্রলে আনুন(আগের পর্বে কৌশল দেখান হয়েছে)।

আলহামদুলিল্লাহ্! আশা করা যায় গাড়ি চালু হওয়ার জন্য প্রস্তুত।

প্রথম গাড়ি চালনা

ইঞ্জিন চালু করার নির্দিষ্ট স্থানে চাবি প্রবেশ করান। প্রথমে রয়েছে locked। ডান দিকে (ঘড়ির কাঁটার দিকে) একবার ঘোরান। সেখানে লেখা Off। তারপর আরেকবার ঘোরান। এখন চাবিটি On এর দিকে। ড্যাশবোর্ড সহ প্রয়োজনীয় জায়গায় আলো জ্বলে উঠেছে। এর মানে হলো আপনার গাড়িতে বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো সচল হয়ে উঠেছে। এখনও কিন্তু ইঞ্জিন চালূ হয়নি।

১. ক্লাচ চেপে ধরুন।চাবিটিকে একটু মোচড় (ঘড়ির কাঁটার দিকে) দিয়ে এক সেকেন্ড ধরে রেখে ছেড়ে দিন। ইঞ্জিন চালু হয়ে যাবে। যদি একবারে না পারেন তবে বার বার করে অনুশীলন করুন।

ইঞ্জিন চলছে। গাড়ি কিন্তু চলছে না। ঠিক কিনা?

২. ক্লাচ চেপে গিয়ারটিকে নিউট্রাল থেকে ফার্স্ট এ নিন।গাড়ি কিন্তু এখনও চলছে না। চলবে কী করে! আমরা তো ক্লাচ চেপে রেখেছি। ক্লাচ চাপা মানে তো গাড়ি নিউট্রালে। আর নিউট্রাল মানে তো ইঞ্জিন থেকে চাকা বিচ্ছিন্ন, তাই না? তাছাড়া পার্কিং ব্রেইকও তো লাগানো।

৩. পার্কিং ব্রেইক অফ করুন।

৪. ক্লাচ ধীরে ধীরে ছাড়তে থাকুন। গাড়ি চলছে না, তাই না? আরো একটু ছাড়ুন। এখনও চলছে না। আরো একটু ছাড়ুন। এবার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে। ক্লাচ ঠিক যে পর্যায়ে আসার পর গাড়ি চলা শুরু করেছে তাকে বলে ক্লাচের বাইট/বাইটিং পয়েন্ট(bite/biting point)। খুব ভালো করে এটা মনে রাখুন। ড্রাইভিং শেখার সময় এই নামটা বার বার আসবে। এটাকে কেউ কেউ হাফ ক্লাচ (half clutch) ও বলে থাকে। তবে সব গাড়ির বাইটিং পয়েন্ট কিন্তু এক নয়। আপনি যে গাড়ি চালাবেন সেটার বাইটিং পয়েন্ট বের করে নেবেন। ক্লাচ বাইটিং পয়েন্টে আসার সাথে সাথে গাড়ি সামনের দিকে ঝুঁকবে, আগে বাড়ার জন্য আঁকুপাঁকু শুরু করবে। অর্থাৎ আগে বাড়ার জন্য প্রস্তুত। ইঞ্জিনের শব্দ পাল্টে যাবে। ক্লাচ ঠিক কোন পর্যন্ত ছাড়ার পর এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে সেটা ভালো করে মাথায় গেঁথে নিন।

আরে! আমাদের গাড়ি তো চলছে!

৫. ক্লাচকে বাইটিং পয়েন্টে ২/৩ সেকেন্ড ধরে রাখুন। একটু এগুনোর পর আস্তে আস্তে ছেড়ে দিন। গাড়ি নিজের মনে চলতে থাকবে। গাড়িকে চলতে দিন। এখন আর কোনো কিছুতে চাপাচাপি/হাতাহাতি ;) করবেন না। আপনি যেহেতু জীবনে প্রথম গাড়ি চালাচ্ছেন সেহেতু বিষয়টা জটিল না করে একদম সহজে এভাবে চালানো শুরু করুন। যথাসময়ে আমরা গাড়িকে আগে বাড়ানোর (moving off) আদর্শ পন্থা জেনে নেব, কেমন?

এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যে ক্ষণের স্বপ্ন আপনি এতদিন দেখে এসেছেন! চুপচাপ উপভোগ করুন।শুধু স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকুন।

কিছুক্ষণ চলার পর আমরা গাড়িটিকে থামাবো। থামাবেন? নাকি অনন্তকাল এভাবে চলতেই থাকবেন? এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত, বলুন তো! না না আমাদের থামতেই হবে!

৬. ক্লাচ চেপে ধরুন। তারপর ব্রেইক আস্তে আস্তে চাপতে থাকুন। গাড়ির গতি আস্তে আস্তে কমতে কমতে এক সময় থেমে যাবে। এ অবস্থায় গিয়ার টেনে নিউট্রালে আনুন। এবার চাইলে ক্লাচ ছেড়ে দিতে পারেন। গিয়ারের কারণে গাড়ি নিউট্রালে আছে। পার্কিং ব্রেইক অন করুন। পায়ের ব্রেইক ছেড়ে দিন। কারণ পার্কিং ব্রেইক দেয়া আছে। গাড়ি এদিক-সেদিক যাবে না। আপনার কাজ শেষ? আরে, নাহ্! গাড়ি থামলেও ইঞ্জিন কিন্তু চলছে।

৭. চাবি বাম দিকে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে)ঘোরালে ইঞ্জিন অফ হয়ে যাবে।আরেকবার ঘোরালে Locked হবে। চাবি খুলুন। গাড়ি থেকে বের হয়ে আসুন। এবার মান্না স্টাইলে একটা খ্যামটা নাচ দিন! :P খবরদার! গাড়ির ভেতর নাচানাচি করবেন না।

অদ্য হইতে আপনি মহামান্য ড্রাইভার হইয়া গেলেন!!

আজকে আপনি গাড়ির ইঞ্জিন চালু করা, গাড়িকে আগে বাড়ানো, তারপর থামানো (দাঁড় করানো), তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করা এসব শিখলেন।

আগামী অন্তত এক সপ্তাহ ঠিক এ কাজটিই বার বার করে করে আত্মস্থ করবেন। তাড়াহুড়া করবেন না। প্রতিটি ধাপ ভালোভাবে চর্চা না করে পরবর্তী ধাপে যাবেন না।

এধাপে দু’টি জিনিস মনে রাখবেন-

১. অন্তত এক সপ্তাহ ধরে চর্চা করবেন।

২. যে গাড়িটি দিয়ে চর্চা করছেন সেটার ক্লাচের বাইট পয়েন্টটি ধরার চেষ্টা করবেন। ঠিক কতটুকু ক্লাচ ছাড়লে বাইট পয়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে সেটা বার বার করে করে মাথায় গেঁথে নিন এবং পা কে অভ্যস্থ করান।

আমরা বড়ই অস্থির! কোনো কিছুই ভালো করে শিখতে পারি না। অল্প শিখেই নেমে পড়ি। মনে রাখবেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ চালকের অদক্ষতা। দক্ষ হওয়ার জন্য প্রথমে ভালো করে শিখতে হয়, তারপর চর্চা করে করে সেটাকে আত্মস্থ করতে হয়। যখন আত্মস্থ হয়ে যাবে তখন আপনি সচেতনভাবে চিন্তা না করে অবচেতন মনে অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষতার সাথে চালাতে পারবেন। এটাকে বলে Muscle Memory । আত্মস্থ করতে পারলে যেকোন বাজে পরিস্থিতি তৎক্ষণাৎ সামাল দিতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

আজ এ পর্যন্তই থাক।

পরের পর্বে ইনশাআল্লাহ আমরা গাড়ির গতি বাড়ানো, কমানো ইত্যাদি শিখবো।

Comments