বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে

 --------------------------

9:10 pm Friday, August 20, 2021

-------------------------------

স্কুলে আমরা একটা ভাব সম্প্রসারণ পড়েছিলাম – বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

দু:খের বিষয় আমরা শুধু পড়ি আর মুখস্ত করি; জ্ঞানের নির্যাস গ্রহণ করতে পারি না।

এই ভাব সম্প্রসারণের ভাবার্থ অনুধাবন করতে পারলে অনেক চিন্তার গলদ ঠিক হয়ে যেত। অবশ্য গলদ ঠিক করার সদিচ্ছা যদি থাকে তবে।

বাঘ এবং বিড়াল দু’টিই বিড়াল প্রজাতির প্রাণী।

বাঁশ এবং ঘাস দু’টিই ঘাস প্রজাতির উদ্ভিদ।

বিষয়টা কিন্তু গুরুতর।

বাঘকে বিড়াল মনে করে ঘরে দুধ-ভাত দিয়ে পালা যাবে কি যদিও এরা একই প্রজাতির প্রাণী?

বাঁশকে ঘাস কিংবা ঘাসকে বাঁশ মনে করা যাবে কি? দু’টিকে একই কাজে ব্যবহার করা যাবে কি?

ধরুন আপনি বাসায় একটা ফুটফুটে সাদা বিড়াল পালেন।বেশ আদুরে বিড়াল, জাদু সোনা মনি টাইপের! একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ আপনার মানবীয় চেতনা জাগ্রত হলো। আপনার মনে হলো এই বিড়ালটিকে ঘরে আটকে রেখে দুধভাত খাইয়ে নাদুসনুদুস করাটা আপনার গুরুতর দুধপাপ হয়েছে। এভাবে প্রাণীটিকে ঘরে আটকে রাখা বিরাট অন্যায়। এতে ‘প্রাণীধিকার’ লঙ্ঘন হয়েছে। যেই ভাবা সেই কাজ। আপনি সেদিনই বিড়ালটিকে সুন্দরবনে রেখে এলেন। আপনি তো আপনার চেতনার প্রাবল্যে বিড়ালটিকে বনে রেখে এলেন। কিন্তু একবার ভাবুনতো এই গৃহপালিত বেচারা বিড়ালটি বনের মত একটা বৈরি পরিবেশে কদ্দিন টিকে থাকবে! কিংবা ধরুন আপনি ভাবলেন বনের বাঘগুলো কত্ত কষ্ট করে মানুষ ধরে খায়। তাও আবার সব সময় তো আর সুস্বাদু মানুষের মাংশ কপালে জোটে না। আপনার মনে হলো এভাবে বনে রাখাতে বাঘের বাঘাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। বনের বাঘকে লোকালয়ে পুনর্বাসনে আপনি লোকজন নিয়ে পরিবেশ আন্দোলন শুরু করলেন। যদি একবার বাঘগুলোকে লোকালয়ে পুনর্বাসন করা হয় তাহলে কি বাঘকান্ড হবে ভেবে দেখুনতো।

বাঘ আর বিড়াল উভয়ই একই প্রাজাতির প্রাণী হলেও দু’টোর শরীরের রসায়ন, মনের রসায়ন ভিন্ন। ঘরের পোষা বিড়াল পরম আদরে দুধভাত খেয়ে আর নরম তোষকে শুয়ে অভ্যস্ত। তাকে আল্লাহ এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। ওদিকে বাঘ বনের বৈরি পরিবেশ নিজ উদ্যেগে খাবার সংগ্রহ করে খেতে আর রোদ বৃষ্টির মধ্যে ঘুমাতেই অভ্যস্ত। বাস মাংশ খেয়ে অভ্যস্ত। তাকে শখ করে দুধভাত খাওয়ালে সে বেশিদিন বাঁচবে না। আর বিড়ালকে তুলুতুলু করে মানুষের মাংশ খাওয়ালে তার ডায়রিয়া-কলেরা হবে। দেখুন একই প্রজাতির প্রাণিকে আল্লাহ কতটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সৃজন করেছেন। এখানেই আল্লাহ মাহাত্ম্য। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য উভয়েরেই স্বস্ব ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। সৃষ্টিকর্তা চাইলে বাঘ-বিড়াল আলাদা আলাদা সৃষ্টি না করে হয় সব বিড়াল নাহয় সব বাঘ সৃষ্টি করতে পারতেন। নিশ্চয় এর মধ্যে গূঢ় রহস্য রয়েছে।

এবার বলুন, বিড়ালের প্রতি অতি দরদ দেখাতে গিয়ে তাকে বাঘের অধিকার দেয়া কিংবা বাঘকে বিড়ালের অধিকার দেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? আপনি যদি সত্যিই বাঘ-বিড়ালের দরদী হয়ে থাকেন তবে বাঘকে বাঘের অধিকার আর বিড়ালকে বিড়ালের অধিকার দেয়ার কথা বলুন। বিড়ালকে যেভাবে রাখলে সে অধিকতর ভালো থাকবে সে বিষয়ে কথা বলুন। বাঘকে যেভাবে রাখলে সে আরো ভালো থাকবে সেটা করুন। তা না করে আপনি যখন বিড়ালকে বাঘের অধিকার দেয়ার কথা বলেন তখন হয় আপনি না বুঝে সেটা করেন কিংবা বুঝে শুনে বিড়ালের বারোটা বাজিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার পায়তারা করেন। বিড়ালকে যখন আপনি ভোংভাং করে বোঝান যে, তোমাকে বাঘ হতে হবে, বাঘের মত ডোরাকাটা দামী চামড়া গায়ে দিয়ে ঘুরতে হবে, বাঘ যা যা করে তোমাকেও তাই তাই করতে হবে, বাঘ যা যা খায় তোমাকেও তাই তাই খেতে হবে তখন স্পষ্টতই আপনি বিড়াল স্বত্বাকে অপমান করেন। আপনি ছলে বলে কৌশলে বিড়ালকে বোঝাতে চাচ্ছেন যে, বিড়াল জিনিসটা খুবই নীচুজাতের ফালতু, বিড়ালের আসলে কোনো দাম নেই, বাঘই নামী দামী জিনিস। তুমি যখন বাঘ হতে পারবা তখনই তুমি জাতে উঠবা। বিড়ালকে বাঘ হওয়ার প্ররোচনা দিয়ে আপনি বিড়ালকে দিয়ে আপনার কুমতলব চরিতার্থ করছেন। আপনি যদি বিড়ালকে ভালোই বাসতেন তবে তাদেরকে সব সময় বিড়ালের মত বিড়াল হওয়ার মন্ত্র দিতেন। তাদের প্রয়োজনীয় অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতেন। আপনি আসলে বিড়ালের মঙ্গল কামনা করেন না। আপনি শুধু বিড়ালের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে দিয়ে সার্কাস খেলছেন। সার্কাস দেখানো আপনার ব্যবসা। বেচারা বিড়াল যদি সেটা বুঝতো!

 

Comments