১২ জুলাই, ২০২১, সকাল ৮:৪১ (কোপা আমেরিকা কাপ -২০২১ ফাইনাল(আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল) । অনুষ্ঠিত ১১ জুলাই, ২০২১ সকাল ৬টা)
---
বিটিভির অনেক পুরানো একটা বিজ্ঞাপন ছিল ঘরে বানানো ওরস্যালাইনের। সুজা খন্দকারের মুখে ছিল এই সংলাপ- দিলাম ঘু…টা, দিলাম ঘু…টা। পানিতে লবণ-গুড়কে মিশিয়ে ঘুটা দিলে লবণ-গুড়ের যে অবস্থা হয় ঠিক তেমন অবস্থা হয় যখন খেলোয়াড়দের জটলার মধ্যে ছোট ছোট নান্দনিক পাসে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা আর দর্শকদের আত্মহারা করে বল বের করে গোল দেয়া হয়। জ্বি, ঠিক ধরেছেন! আর্জেন্টিনা দলের এটাই ছিল ব্র্যান্ডিং খেলা। এ খেলা দিয়েই তারা সারা বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থক জুটিয়েছিল। এ ধরনের নান্দনিক খেলা শুধুই আর্জেন্টাইনদের খাস। এটাই তাদের স্বভাবসুলভ পরিচিতিমূলক খেলা। কিন্তু দু:খের বিষয় যখন থেকে তারা এই নান্দনিক স্কিল ফুটবল থেকে সরতে শুরু করে তখন থেকেই ভুগতে থাকে শিরোপা খরায়।
আশার বিষয় হচ্ছে, কোপা আমেরিকা ২০২১ কাপের ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের খেলায় আর্জেন্টিনা কিছুটা হলেও ক্ষণে ক্ষণে তাদের সেই ব্র্যান্ডিং খেলার ঝলক দেখিয়েছে। বিশেষ করে মাঝমাঠে বেশ দারুণ কিছু পাস দর্শকদের বিমোহিত করেছিল তা নিশ্চয় করে বলা যায়।
আমি আগেও বলেছিলাম- আর্জেন্টিনা জেতার আগে জেতে, হারার আগে হারে। আজকের খেলার প্রথম থেকেই তাদের শরীরি ভাষা বলে দিচ্ছিল তারা জিততে এসেছে, হারতে নয়। অসাধারণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বল ধরা, নির্ভুল ছোট ছোট পাস দেয়া ছিল দেখার মত। বিশেষ করে মাঝমাঠ এবং রক্ষণভাগ এর আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা ছিল দারুণ। এত প্রশংসনীয় রক্ষণভাগ এর আগে কখনও আর্জেন্টিনা দলে দেখেছি কিনা মনে আসছে না। মাঝমাঠের দর্শনীয় পাস আর রক্ষণভাগের দৃঢ়তার দুর্গের ফলই পেয়েছে আর্জে্ন্টিনা। সে হিসাবে আক্রমণভাগ অবশ্য ছিল কিছুটা নিস্প্রভ। এই ম্যাচ সহ পূর্ববর্তী প্রতিটি ম্যাচে ডি মারিয়ার জ্বলে উঠা ছিল চোখে পড়ার মত। খেলার শুরু থেকেই ডি মারিয়াকে নামানো ছিল কোচ স্কালেনি-র সেরা সিদ্ধান্ত। ডি মারিয়ার গোলটিতে অফ সাইডের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমার কাছে তো সেটা অফ সাইডই মনে হয়েছিল। যদি অফ সাইডকে পাশে সরিয়ে বলি তাহলে বলবো - গোলটি ছিল সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস। ডি মারিয়ার বল রিসিভ করা এবং গোলরক্ষকের মাথার উপর দিয়ে মাপা শটে গোলপোস্টের উপরের বারের অনেকটা কাছ ঘেষে জালে পাঠানো ছিল দেখার মত। ডি মারিয়ার জায়গায় অন্য কোনো ননস্ট্রাইকার থাকলে হয় গোলপোষ্টের অনেক উপর দিয়ে বল মারতো নয়তো গোলরক্ষকের গায়ে মারত। এখানেই স্ট্রাইকারদের মাহাত্ম। মেসি খুব সম্ভবত ফাইনাল ফোবিয়ায় ভোগে। মানসিক চাপে ছিল মনে হয়। শারীরিকভাবেও পুরোপুরি ফিট ছিল কিনা আমার সন্দেহ। গত ম্যাচে যেভাবে আহত হয়েছিল মনে হয়েছিল মাঝ খেলা থেকে উঠে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খেলেছিল। এই ম্যাচেও আমার সন্দেহ ছিল খেলতে পারবে কিনা। সব মিলিয়ে মানসিক ও শারীরিক চাপে ছিল বলে আশংকা করি। চাপের কারণেই হয়তো শেষ দিকে সহজ গোল মিস করেছিল। ম্যারাডোনা ছিল অনন্য। পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়াতেন। যেখানে বল সেখানেই ম্যারাডোনা। মেসির মধ্যে এটার অভাব বোধ করি। তবে মানতেই হবে ম্যারাডোনা ম্যারাডোনাই, মেসি মেসিই। মেসিরে নিস্প্রভতার কারণেই হয়তো লাউতারোও নিস্প্রভ ছিল। গোলরক্ষক মার্তিনেজের কথা না বললেই নয়্ সেমিফাইনাল ম্যাচের মত ফাইনাল ম্যাচেও তার ঝলক থেকে সমর্থকেরা নিরাশ হয়নি। আমি তো বলি ব্রাজিল নিজেদের কমতির কারণ ছাড়াও যদি হেরে থাকে তবে হেরেছে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ আর গোলরক্ষক মার্তিনেজের কাছে।
আরেকটা বিষয় না বললেই নয়। আর তা হলো খেলোয়াড়দের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য। প্রতিটি বিশ্বকাপেই তাদের এই ঐক্যের অভাবের কথা বেশ জোরেশোরেই শোনা যেত। কিন্তু এই কোপাতে দেখা গেল পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র। আর্জেন্টিনা-কলম্বিয়া ম্যাচে লাউতারোর গোলটি যেভাবে লাউতারো উদযাপন করলো তাতে তাদের ঐক্যই প্রকাশ পায়। মেসিকে ডেকে সে তার পিঠে তুলে নেয়। আর তাদের কথায় কোচের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশও পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে দলটি শিরোপা জয়ের উপযুক্ত ছিল নি:সন্দেহে। এই ঐক্যতান যদি পূর্ববতী বিশ্বকাপগুলোয় থাকতো তবে ইতিহাস অন্যরকম হত।
অপরদিকে ব্রাজিলের খেলা ছিল মোটামুটি হতাশাব্যঞ্জক। মজার ব্যপার হলো এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ছিল প্রচন্ড চাপের মধ্যে আর ব্রাজিল ছিল ফুরফুরে ভারমুক্ত। অথচ খেলায় দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের মনে হলো ছ্যাড়াব্যাড়া। আত্মবিশ্বাসের অভাব। পরিকল্পনার অভাব। বল ঠিকমত ধরতে পারছিল না, পাস করতে পারছিল না, আয়ত্বে রাখতে পারছিল না, পরিকল্পিত আক্রমণ করতে পারছিল না। তবে খেলোয়াড়েরা প্রচুর পরিশ্রম করে খেলছিল এটা নিদ্বিধায় বলা যায়। অপরিকল্পিত ও আত্মবিশ্বাসহীন পরিশ্রমে খুব ভালো ফল বয়ে আনে না আজকের ম্যাচে ব্রাজিলের হার তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুপরিকল্পনা আর আত্মবিশ্বাস ছাড়া যতই চাপাচাপি করো কোনো লাভ নাই! নেইমার দৌড়ে খেলেছিল, প্রচুর পরিশ্রম করেছিল। কিন্তু ঐযে.. আত্মবিশ্বাস আর পরিকল্পনার ঘাটতি…। ব্রাজিলের খেলা আমার কখনই মন কাড়েনি। তবে তাদের লড়িয়ে স্বভাব এবং জেতার জন্য খেলা এই দু’টি বৈশিষ্ট্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ ম্যাচেও তারা লড়িয়ে ছিল। কিন্তু ঐ একই কারনে…। ব্রাজিল আরো ভালো খেললে খেলাটা আরো মনোজ্ঞ হত নি:সন্দেহে। তাদের গোলটা দেয়া যেত। রেফারিংয়ের মান দিয়ে আমি মনে হয় প্রশ্ন তুলতেই পারি। নেইমারকে যেভাবে কুংফু স্টাইলে ফাউল করা হলো সেটাতে হলুদ কার্ড নয় লাল কার্ড প্রাপ্য ছিল আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের। তাছাড়া আর্জেন্টিনার ডি বক্সের ভেতরে একটা ফাউল দেয়া হয়নি। একটা পেনাল্টি কিক পাওনা ছিল ব্রাজিলের।
এগুলো সরিয়ে রেখে যদি দলের নৈপুন্যের বিষয়টা সামনে আনি তবে বলবো – প্রতিটি বিভাগে ব্রাজিলের চাইতে নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেই শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের কোচের মুখেও একই সুর অনুরণিত হতে দেখা যায়।
পরিশেষে বলবো, আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের কাছ থেকে গায়ের জোরে খেলা কখনই সমর্থকেরা প্রত্যাশা করে না। ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা যখন ফিফা বিশ্বকাপে খেলতো তখন পুরো ফিফা বোর্ড, রেফারি ছিল আর্জেন্টিনার বিরোধী। অনেক খেলায় তাদের একপেশে মনোভাবের কারনে আর্জেন্টিনা হেরেছে। কিন্তু সে হার ছিল সমর্থকদের গলার হার। গলা উঁচিয়ে তাদের গর্ব করার অবকাশ ছিল। একদিকে ছিল খেলার নান্দনিকতা আর অন্যদিকে ছিল না মেরে খেলা। তারা মার খেতো কিন্তু কখনও মারতোনা এটাই ছিল তাদের মাহাত্ম্য। কিন্তু হায়! আজ সেই সোনালী যুগের আর্জেন্টিনা কোথায়? আর্জেন্টিনা যদি মারদাঙ্গা খেলা সর্বোতভাবে পরিহার করে তাদের সেই ঐতিহাসিক মন কাড়া ছোট ছোট পাস নির্ভর খেলায় পুনরায় ফেরত না যায় তাহলে গত ২৯ বছরের মত সামনের ২৯ বছরও হয়তো আবার অপেক্ষার প্রহর গুনে যেতে হবে। এই সত্যটা তাদের উপলব্ধি করতে হবে।
Comments
Post a Comment