18 June,
2017
একটি ঢাকাগামী
বাস।
বাসে আছে একজন
(এবং কেবলমাত্র একজন) চালক।
একজন কন্ডাকটর
এবং একজন হেল্পার।
আর আছে কিছু যাত্রী।
সবার গন্তব্য ঢাকা পৌঁছা।
এখন যদি মাঝ পথে
হেলপার-কন্ডাকটর আর যাত্রীরা হঠাৎ করে তাদের অধিকার বিষয়ে অতি সচেতন হয়ে ওঠে এবং মনে
করে যে তাদেরকে বাস চালাতে না দিয়ে ড্রাইভার তাদের অধিকার নষ্ট করেছে এবং এক যোগে সবাই
গাড়ি চালানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগে যায়, তাহলে কেমন হবে?
কিংবা ড্রাইভার
যদি বলে, ’আইজকা শইলডা ম্যাজ ম্যাজ করতাছে?! আফনেরা কেউ গাড়িডা এট্টু চালান :P । তাহলে
বিষয়টা কেমন হবে?
বাস কি ঢাকা যাবে
নাকি স্বগ্যে যাবে? :P
প্রত্যেকটা লোকের
দায়িত্ব এবং কর্তব্য আলাদা আলাদা এবং বিশেষায়িত। চালকের দায়িত্ব নিরাপদে গাড়ি চালানো
এবং গন্তব্যে সবাইকে স্বশরীরে ;) পৌঁছে দেয়া। হেল্পার আর কন্ডাকটরের দায়িত্ব চালককে
অন্যান্য কাজে সাহায্য করা। আর যাত্রীদের দায়িত্ব অস্থির না হয়ে ভদ্রভাবে গাড়িতে বসে
থাকা। চালককে বিরক্ত না করাই তাদের মূল দায়িত্ব। এভাবে সবার সম্মিলিত এবং যথাযথ দায়িত্ব
পালনের মধ্য দিয়ে গাড়িটি কোনরূপ দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে এক সময় তার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।
এবং এটাই হবে সবার কাম্য। চালক, হেল্পার, কনডাকটর, যাত্রী সবারই এটা কাম্য।
সবার যেমন দায়িত্ব-কর্তব্য
আলাদা তেমনি অধিকারও সবার আলাদ আলাদা। যাত্রীরা যেমন হাত-পা ছড়িয়ে, মাজা ঘুরিয়ে, চোখ
বুজে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভ্রমন করতে পারে ঠিক তেমনটা যদি চালকও করতে চায় তাহলে অবস্থা কি
দাঁড়াবে? চালক যদি মনে করে মাজা ঘোরাতে আর ঝিমোতে না পারায় তার অধিকার খর্ব হয়েছে তাহলে
কি হবে? আবার সব যাত্রী যদি এক যোগে – ওস্তাদ ডাইনে পেলাস্টিক, বায়ে বদনা—বলে চেঁচাতে
থাকে তবে বাস কি বসবাস যোগ্য থাকবে?
যদি সবাই চালক
হতে চায় কিংবা সবাই যাত্রী হতে চায় তবে কি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।
এখানে গাড়ি হচ্ছে
সংসার, চালক হচ্ছে বাবা, হেল্পার-কনডাকটর হচ্ছে মা, আর যাত্রী হচ্ছে সন্তান-সন্ততি।
ধরি ফুটবল অথবা
ক্রিকেট টিমের কথা। টিমে থাকে একজন অধিনায়ক(ক্যাপটেন), একজন সহ-অধিনায়ক, আর থাকে সাধারণ
খেলোয়াড়। এটা কেন করা হয়? সবাইকে ক্যাপটেন কিংবা সবাইকে সাধারণ খেলোয়াড় করে দিলেই তো
হতো। কোনো একজনকে ক্যাপটেন করে দেয়াতে অন্যান্য খেলোয়াড়দের ভালো হয়েছে নাকি খারাপ হয়েছে?
নাকি তাদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে? এটা করা হয় সবার স্বার্থেই। প্রত্যেকটা খেলোয়াড়
এবং তৎসংশ্লিষ্ট অন্যরা চাইবে দল ভালো খেলুক, দল জিতুক। হারতে কেউই চায় না। দল জিতলে
প্রত্যেকটা খেলোয়াড়েরই সুনাম হয়। আর হারলে জবাবদিহিতা করা লাগে অধিনায়ককে যদিও হারের
জন্য সবাই কম বেশি দায়ী থাকে। হারলে সবারই দুর্নাম হয়।
সংসারেও তেমনি
থাকে একজন অধিনায়ক (বাবা), একজন সহ-অধিনায়ক (মা) আর সাধারণ খেলোয়াড় (সন্তান-সন্ততি)।
বাসের আর দলের
যেমন থাকে গন্তব্য আর উদ্দেশ্য, তেমনি একটা সংসারেরও থাকে গন্তব্য আর উদ্দেশ্য। সংসারের
গন্তব্য আর উদ্দেশ্য হলো দুনিয়া ও আঁখিরাতের সফলতা।
বাসকে তার গন্তব্যে
পৌঁছে দেয়ার মূল দায়িত্ব চালকের, দলকে জিতানোর মূল দায়িত্ব অধিনায়কের। আর সংসারকে যথাযথ
গন্তব্য ও উদ্দেশ্যে চালিত করার মূল দায়িত্ব বাবার। মূল দায়িত্ব অন্যদের নয়, অন্যদের
দায়িত্ব বাবাকে সাহায্য করা, সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা।
শুধু অর্থ উপার্জন
করাই বাবার মূল দায়িত্ব নয় যদিও এটা একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এবং অর্থ উপার্জন
কোনোভাবেই মায়ের দায়িত্ব নয়। তাঁদেরকে সেভাবে আল্লাহ তৈরিও করেননি। কেন বাবাই হবেন
অধিনায়ক, কেন উপার্জনের দায়িত্ব শুধু বাবার, কেন মায়ের নয়, কেন কেন কেন—নিশ্চয়ই এসব
প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগছে। তো, এগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বতন্ত্র লেখার দাবী রাখে।
তোলা রইল, ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে একটা
গবেষণা ফলাফলের কথা বলি। তথ্য-সূত্র আমার হুবহু মনে থাকে না। তথ্য-সূত্র না দিতে পারলেও
ঘটনা কিন্তু সত্য।
বেশ ক’বছর আগে
পত্রিকায় পড়েছিলাম—নেদারল্যান্ড এর একদল গবেষক দু’দল দম্পতির উপর গবেষণা করেন। একদলে
আছে সেইসব দম্পতি যাদের স্বামী-স্ত্রী উভয়ই বাইরে চাকুরি করে। আরেক দলে আছে সেইসব দম্পতি
যাদের পুরূষ বাইরে কাজ করে এবং মহিলা ঘরে কাজ করে। তো, তারা অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে
লক্ষ্য করলেন প্রথম দল দম্পতিদের বিবাহ বিচ্ছেদের হার দ্বিতীয় দল দম্পতিদের বিচ্ছেদের
হারের চেয়ে বেশি। এ ফলাফলে তারা নিজেরাও বিস্মিত। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, যখন নারী
ও পুরূষ উভয়ই বাইরে কাজ করে বা উভয়েই একই কাজ করে তখন দু’জনের মধ্যে একটা প্রতিযোগী
প্রতিযোগী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। যখন তারা দু’জনেই বাইরে কাজ করে তখন তারা মনে করে যে
আমি-ই তো সংসারের জন্য বেশি কাজ করি, বেশি ছাড় দেই। অপর জন তো এতটা করে না। এভাবে একটা
প্রতিযোগীতার সৃষ্টি হয় যার ফলশ্রুতি হয় এক সময় বিবাহ বিচ্ছেদ। আর যখন একজন ঘরে আর
একজন বাইরে কাজ করে তখন তারা নিজেদের কাজ নিয়ে অপরের সাথে তুলনা করতে পারে না, কারণ
তাদের দু’জনের কাজ দু’ধরনের। ফলে প্রতিযোগীতারও সৃষ্টি হয় না।
কথা হলো কে ঘরে
কাজ করবে আর কে বাইরে কাজ করবে? এর জবাব জানতে চাইলে অনেক গভীর চিন্তা করতে হবে। নারী
ও পুরূষের শরীর এবং মনের রসায়ন না বুঝলে এই প্রশ্নের জবাব জানা সম্ভব নয়।
চিন্তাশীল পাঠককে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’ আর S. M. Zakir Hussain এর ‘নারীর মন’ অন্তত এই দু’টি
বই পড়ার জন্য পরামর্শ দেয়া গেল।
Comments
Post a Comment